ফিরোজ আহমেদ

সুন্দরবন আবারো শিরোনাম হল। একটা না, দুটো। রামপালে বিমানবন্দর হবে, একনেকে এমন প্রস্তাব পাশ হয়েছে। সারবাহী আরেকটা জাহাজ ডুবেছে সুন্দরবনে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের খাড়াটাও বহুদিন ধরে সুন্দরবনের ওপর ঝুলে আছে। ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত কয়লাখনি প্রতিরোধ করা জাতীয় কমিটিকে ঘিরে মানুষের আশা ছিল, সুন্দরবনকে ঘিরে এই অশুভ ছায়াটাকে প্রতিরোধের লড়াইয়ে তারা ভাষা যোগাবেন। সিন্দাবাদের ভূতের মত ঘাড়ে চেপে থাকা সরকারী বামদের তৎপরতায় সেটাও স্তিমিত হয়ে আছে।  সুন্দরবনের ছবিটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে, কে তাকে বাঁচাবে?বনের ছবি আঁকা খুব সহজ না। মানুষেরা অনেক সময়েই গাছের ভিড়ে বনটাকে হারিয়ে ফেলে। বুড়িগঙ্গা নদীতে কোন মৃত প্রাণী দেখেছেন কখনো? দেখেননি, কেননা বহু বছর হলো কোন প্রাণের পক্ষে বাঁচা হয় না সেখানে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের ঘাটতি, তার সাথে নৌযান আর জাহাজের তেল এবং কারখানাজাত বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যে উপস্থিতি এটার জন্য দায়ী। এ কারণেই বুড়িগঙ্গা নদীর বড় অংশে কোন মাছ পাওয়া যায় না, অথচ আমাদের শৈশবেও সেখানে মাছ-পাখি-শুশুক সব ছিল, যদিও তাও কমে আসছিল ক্রমাগতই। এমনকি মাত্র ষাট সত্তুর বছর আগে সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্যের ছোঁয়া  বৃহত্তর ফরিদপুর ছাড়িয়ে ঢাকা জেলার উপকণ্ঠ পর্যন্ত উপস্থিত ছিল। আজ সেগুলোর কিছুই নেই। সুন্দরবনের বাদাবন এখন টিকে আছে খুবই খণ্ডিত একটি উপকূলে।

আপনার গায়ে অপরিশোধিত তেল লাগলেই নগদে আপনি মারা যাবেন না। সারগোলা পানিতেও মরবেন না আপনি। বনের পশুপাখির দৃশ্যমান বড় অংশের বেলায়ও তাই ঘটবে। সঙ্গতকারণেই তারা উত্সুক প্রতিবেদকের চিত্রগ্রহণযন্ত্রের সামনে যন্ত্রণাবিদ্ধ মৃত্যুবরণ করবে না। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের জন্য এই তেলে দূষিত পরিবেশে বাস করতে বাধ্য হলে আপনার নানান রকম ত্বকের সমস্যা দেখা দেবে, এই পানি পান করলে বক্ষ-হিপণ্ড-মস্তিষ্কসহ সকল অভ্যন্তরীণ যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কর্কট রোগে আপনার আক্রান্ত হবার পরিসংখ্যানিক নিয়তিও খুব সম্ভবত বেড়ে যাবে।

প্রাণীকূলের বেলায় সমস্যাটা আরও জটিল। কারণ জটিল খাদ্যশৃঙ্খল। কারণ তাদের স্পর্শকাতর জীবন। আপনি বাজার থেকে খাদ্য কিনে খান। বাঘ-কিংবা হরিণ তা করে না। তেলের আস্তরের কারণে বহুধরনের ক্ষুদ্র উদ্ভিদ ও প্রাণী তাত্ক্ষণিক মৃত্যুবরণ করে, তাদের আমরা খালি চোখে দেখি না। কিন্তু খালি চোখে না দেখা গেলেও তারা গূরুত্বপূর্ণ। শুধু ‘আহা প্রাণ’ বলেই তাদের প্রাণের দাম থাকা উচিত, কিন্তু বাজারী তর্কশাস্ত্রে তো দরদ অচল। আপনি জানেন তো পৃথিবীতে যত অক্সিজেন মুক্ত হয়, তার বড় অংশ বৃক্ষাদি থেকে আসে না, যদিও আসে উদ্ভিদরাজ্য থেকেই? পানিতে জন্ম নেয়া সবুজ এককোষীরা ফুসফুসধারীদের জন্য বায়ুমণ্ডলেই শুধু অক্সিজেন জোগায় না, পানিকেও বাসযোগ্য রাখে জলচর ফুলকাধারীদের জন্য। পৃথিবীব্যাপী এই সবুজ এককোষীদের বিপন্নতার অন্যতম কারণ জাহাজ চলাচলের জন্য নিঃসৃত তেল, শিল্পদূষণজাত বর্জ্য। সুন্দরবনের সাম্প্রতিক তেল ছড়িয়ে পড়াটি বহু বছর ধরে শিল্পকারখানা বা জাহাজ চলাচলে যা ঘটতো, তাকে সম্পন্ন করেছে কয়েক ঘণ্টায়। গোটা শ্যালা নদীতে এখন এদেরকে পাওয়া যাবে না বহুদিনের জন্য। এদেরকে তো খালি চোখে দেখাও যায় না, কিন্তু বাঘ-হরিণ সকলেই এদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেই জড়িত।

শুধু অক্সিজেন দিয়ে নয়, এরা খাদ্যশৃঙ্খলের সবচে’ বড় অংশ হিসেবেও ভূমিকা রাখে। এদেরকে খেয়ে বেঁচে থাকে ক্ষুদে-বড় মাছেরা। ছোট মাছেরা বড় মাছেদের খাদ্যের জোগান দেয়। প্রাণ হিসেবেও ক্ষুদ্র অদৃশ্যপ্রায় জীবেরা সবচে সহজে যে কোন রাসায়নিক বিরূপতার শিকার হয়। এদেরকে চোখে দেখা যায় না, চোখে পড়ার জন্য, অভাব অনুভব করার জন্য মনুষ্য সম্প্রদায়ের পর্যটকদের কাছে মেনি মাছ আর লাল কাঁকড়ার আকৃতির অন্তত হতে হয়। শুশুক কী পাখি রাসায়নিক থেকে চাইলে দূরে সরে যেতে পারে, অদৃশ্যপ্রায় কুচোচিংড়ি কিন্তু যাবে না। ওরাও খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তিস্বরূপ। ফলে তেলের আস্তরে এককোষী উদ্ভিদ ও ক্ষুদে চিংড়ি, পোকামাকড় মৃত্যুবরণ করা মাত্র পানিতে অক্সিজেন ঘাটতি শুরু হবে, অন্যদিকে খাদ্যের অভাবে এদের খেয়ে যারা বেঁচে থাকতো তারাও যথাসম্ভব স্থানত্যাগ করবে। ফলে এই স্থানত্যাগ করা প্রাণীদের শিকার করে বেঁচে থাকা আরেকটু বড় প্রাণীরাও বিপদে পড়বে।

অন্যদিকে পানি দূষণ মানে জীবনের ভিত্তিস্বরূপ পদার্থটারই অভাব সৃষ্টি হওয়া। পানির ঘাটতি কিন্তু বহু অরণ্যেই প্রবল। এমনকি জলাজঙলার সুন্দরবনেও পানির অভাবে হরিণেরা বহুস্থানে লোকালয়ে চলে আসে মিঠাপানি পান করার জন্য। শ্যালা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল বড়প্রাণীরাও অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়বে।  খাবার পানিতে তেল ভাসলে ওদের পাকস্থলী তা সইবে কেন? তেল নিঃসরণে তাত্ক্ষণিকভাবে যে মাছেরা মারা যাবে, দীর্ঘমেয়াদে ক্ষয়ক্ষতি তারচেয়ে বহুগুণ বেশি হবে। মাছের ডিম ফুটবে না। মাছ না থাকলে পাখিসহ মাছের ওপর নির্ভরশীল প্রাণীরা আসবে না। সারাদেশে  বিরলপ্রায় বহুপ্রজাতির মাছরাঙাসহ সুন্দরবনেই এখনো টিকে থাকা পাখিদের প্রজাতিগুলো সামনের শীতে বাসা বাঁধবে তো? ছানা ফোটাবে তো? ইতিমধ্যেই তাদের মাঝ থেকে কয়েক ডজন প্রজাতি অদৃশ্য হয়েছে শব্দদূষণসহ নানান কারণে।

নগদ টাকার কারবারীদের কাছে দরদ-টরদ কোন যুক্তি না, সে বিষয়ে আমরা তো ইতিমধ্যেই একমত হয়েছি। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের কি হবে? মৌমাছিদের কি হবে, দেশের সবচে বড় মধুর উত্স সুন্দরবনই তো? ওরা শুধু থাকে গাছের মাথায়, ফুলে ফুলে শর্করা খোঁজে? ওদের প্রচুর টলটলে পানিও দরকার লাগে। কিছু হয়তো খায়, কিছু চাকে নিয়ে সাফসুতরোর কাজ করে। পানি দূষিত হলে তারা অদৃশ্য হবে, সাথে যাবে আর সব পোকামাকড়ও। তাদের চাক নষ্ট হবে। তারা নিষ্ক্রিয় হলে পরাগায়ন হবে না, পর-পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল এমন সব সুস্থ গাছের ফুলগুলোতে আর ফল ধরবে না। এদের তো আর্থিক মূল্য আছে। অথচ এরা আপনাকে আদৌ জানান না দিয়ে নীরব বেদনার মত অস্থানে ঝরে যেতে পারবে, আপনি টেরও পাবেন না।

ভাটার টানে তেল নিয়ে যাবে সমুদ্রের গভীরে? আবার ফিরিয়ে আনবে ভরা জোয়ারে, যেমন পদ্মা-মেঘনার স্রোতে ভাটার টানে সমুদ্রে যাওয়া পলিকে আবার ফিরিয়ে দেয় উপকূলে। সেই জন্যই পলি জমে জেগে উঠেছিল সুন্দরবন। সমুদ্র এই তেলকেও ছড়িয়ে দেবে সুন্দরবনের নতুন নতুন স্থানে। শুধু তাই না, অপরিশোধিত তেলের সাথে থাকা পানিতে দ্রবীভূত হতে সক্ষম উপাদানগুলো একদম শুরুতেই পানিতে দ্রবীভূত হয়ে গিয়েছে, তাদের মাঝে ভারী অংশটুকু নদীর গর্ভে আশ্রয়ও নিয়েছে। ফলে দীর্ঘকাল ধরে বিষাক্ত অনেকগুলো খনিজ সম্বলিত অপরিশোধিত ফার্নেস তেলের স্পর্শে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে প্রাণীজগত। মেনি মাছ আর লাল কাঁকড়াদের ‘দৃশ্যমান’ উধাও হওয়া আসলে প্রাথমিক সঙ্কেত মাত্র। আপনাকে শুধু একটু অপেক্ষা করতে হবে। যেমন খুব বড় একটা বন, চকোরিয়া উধাও হয়ে গেলো আমরা যখন কিশোর, আমাদের নাকের ডগা দিয়ে। আমাদের সময়ে বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইতে ভূগোলে পড়ানো হতো এর কথা। এখন মনে হয় নাই, অদৃশ্য চকোরিয়া কিন্তু একটা বড় দৃশ্যমান বাস্তবতা। চাঞ্চল্যকর, শিহরণজাগানো শত শত প্রাণীর মৃতু্যুদৃশ্য দেখার জন্য সুন্দরবনে যেয়ে তাই খুব লাভ হবে না। যুদ্ধক্ষেত্র তো সেটা নয় যে বোমার আঘাতে মারা পড়েছে তারা। অবোধ প্রাণীরা চিত্রগ্রাহকদের সামনে এসে তেল নিঃসরণের ফলে তাদের দুর্দশা জানাবে, অতটা ডিজিটাল এখনো হয়নি।

তেলবাহী একটা নৌযান যে ডুবে গেলো, সেটা একটা ইশারা কেবল, ভবিষ্যতের। গত কয়েক বছরে এখানে সিমেন্টবাহী জাহাজ ডুবেছে, এর চারপাশে গড়ে উঠেছে নানান কলকারখানা, ব্যাপকভাবেই তোড়জোড় হচ্ছে সুন্দরবনের ঘাড়ের ওপর রামপালে বিদ্যুত্ প্রকল্প নির্মাণের। বনে লোকজনের আনাগোণা বেড়েছে বহুগুণ। সামনে আরও বাড়বে। যে প্রাণীরা খানিকটা সহ্য করে নিতে পারে, তারাই টিকে আছে এখানে। কিন্তু যারা তা পারে না, তারা নীরবেই স্থানত্যাগ করেছে। জানেন তো, সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে কোন বাণিজ্যিক নৌযান চলতে দেয়া হয় না, তার আশেপাশে কোন কলকারখানাও স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয় না। ফলে মৃত্যু আমাদের সুন্দরবনের ওপর ‘আছর’ করেছে দীর্ঘকাল ধরেই।

বন মানে তাই যে জটিল ও স্পর্শকাতর প্রাণচক্র। এবং সুন্দরবনের জটিলতা, প্রাণবৈচিত্র্য আর ঘনিষ্ঠ মিথোজীবীতা জটিলতম বাস্তুসংস্থানেরই উদাহরণ।  গাণিতিক হিসেব কষে কোন গাছ কতটা কাটা হলে, কোন মাত্রায় কত রাসায়নিক পানিতে পড়লে, কোন প্রাণীর কতটা বংশ নাশ ঘটলে কিংবা কতটা শব্দদূষণ হলে তা প্রাণীকূলের জন্য অনুমোদনীয় হবে, সেই হিসেব কষার বন্দোবস্ত দেখলেই বোঝা যায়, এই অরণ্য টিকবে না রাষ্ট্রের এই চরিত্র টিকে থাকলে। ‘পাখির ছবি আঁকতে হলে’ নামে একটি  কবিতা আছে জ্যাক প্রেভের-এর, পাখির ধ্যান ছাড়া পাখির ছবি আঁকা যায় না বলেছিলেন তিনি। আমাদের উন্নয়ন প্রতিবেদকগণ সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর সুন্দর সুন্দর আশাবাদের বাক্যরাশি দিয়ে সুন্দরবনের যে ছবি আঁকছেন, তাতে বোঝা যায় আর যাই হোক, অরণ্যের কোন ধ্যান তাদের অন্তরে নেই। সেই মৃত্যুর ক্রন্দন শোনার প্যানপেনে বাগবিস্তারে যেয়ে কার কি লাভ, যদি একবারও যারা এই অরণ্যে নৌযান চলতে দিয়েছে, তাদের নামোচ্চারণও না করা যায়? সুন্দরবনের মৃত্যু যদি সুনিশ্চিতই, বৃথা আহাজারি কেন? আসো নিন্দুকদের তিরস্কার করি, লাল কাঁকড়া আর মেনিমাছের আকৃতির নিচে যা কিছু প্রাণ আছে, তাদের ফুত্কারে উড়িয়ে দেই। তেলে চুবানো সুন্দরী গাছের বীজের বেদনা নিয়ে আবেগপ্রবণ হওয়া চলে না। প্রকৃতিই অজস্র বানায় যাতে অন্তত কয়েকটা টিকে থাকে। কয়েক মাসে কি সুন্দরবন এই খাদ্যশৃঙ্খলের ক্ষতি সামলে উঠতে পারবে না? দৃশ্যমানভাবে পারবে যদি শাহজাহান খানের অনুমতি পাওয়া দেশি আর ভারতীয় জাহাজগুলো ক’টাদিন আরেকটু সামলে চলে, যদি ওরা আর তেলটেল না ফেলে, যদি… রামপালে কয়লা বিদ্যুত্ প্রকল্পটা শুধু হয়ে নিক না একবার! বিমানবন্দর হলে সুন্দরবনে পর্যটন বাড়বে,  তারপর অজ্ঞাত-অদৃশ্যমান রোগে সব সুন্দরী গাছ মরতে শুরু করলে আমরা কাঠও রফতানি করতে পারবো,  আর অরণ্যের ফাঁকাপ্লটগুলো ভরাট করে এত এত জাতীয় প্রবদ্ধি অর্জন করবো যে, আরেকটা সুন্দরবন না হয় বানিয়ে দেয়া যাবে নতুন কোন খানে। সেটাও মস্ত বড় প্রতিবেদন হবে।