রুবেল আবুল হাসান

ইউনেস্কো বলেছে ফারাক্কা সুন্দরবনের ক্ষতি করছে। এটা নতুন কোন তথ্য নয়। আজকের প্রথম আলোতে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান ঠিকই বলেছেন গত ৪০ বছরে শত শত গবেষণায় তা প্রমানিত। কিন্তু পরিবেশমন্ত্রী কি কারণে তাকে এড়িয়ে সব দোষ জলবায়ু পরিবর্নের ওপর চাপিয়ে দিতে চান সেটা বোধগম্য নয়। নদীর প্রবাহ যখন কমে যায় তখন মিঠা পানির স্রোত লবনাক্ত পানিকে দূরে ঠেলে রাখার ক্ষমতা হারায়। তখন বেশি বেশি করে লবনাক্ত পানি ঢুকে পড়তে পারে। এ প্রক্রিয়ায় সুন্দরবন তার একটা অংশ হারিয়েছে, তার বৃক্ষরাজির ধরনে পরিবর্তন হয়েছে, অধিক লবনাক্ততা সহ্যকারী উদ্ভিদ বেড়েছে, কম লবনাক্ততা সহ্যকারী উদ্ভিদ কমেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেে আরও বেশি লোনা পানি ঢুকছে বা ঢুকবে কথাটা ঠিক।গতকাল আরেক রিপোর্টে নীল বোতাম এর উপস্থিতির খবর তো আরেক অশনি সংকেত। অর্থাৎ সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ভয়াবহভাবে বাড়ছে। কিন্তু তাকে এমনভাবে উত্থাপন করা হয় যেন তার সাথে অন্য প্রকৃতি বিধ্বংসী তৎপরতার কোন সম্পর্কই নাই।জলবায়ু পরিবর্তন যেন এক ঐশ্বরিক ঘটনা্, ঐশ্বরিক না হলেও এমন দূরের কারবার যেখানে আমাদের কিছুই করার নাই।বা আমাদের কোন কাজের ফলে আমরা একে কোনভাবে প্রভাবিত করি না, করতে পারব না। আসলেই কি তাই?

একটা সক্রিয় বদ্বীপ হিসাবে বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্য হলো সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির চাইতে তার পলি জমার পরিমান বেশি। যার ফলে ঐতিহাসিকভাবে আমাদের নতুন ভূমি লাভ ঘঠেছে। বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে । কিন্তু ফারাক্কাসহ উজানে আরও আরও বাঁধের কারণে বাংলাদেশের এই সক্রিয় বদ্বীপ চরিত্র আজ ভয়াবহ হুমকির মুখে। ইতিমধ্যেই পলি জমার হার ১৯৭১ সালে যেখানে ছিল তার এক তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। নতুন করে এলাহবাদ থেকে হালদা পর্যন্ত গঙ্গায় ১০০ কিমি পরপর ব্যারেজ নির্মানের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। ভারতে আন্ত:নদী সংযোগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ নানা জায়গায় শুরু হয়ে গেছে। তার মানে সামনে ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর প্রবাহও মারাত্মক হ্রাস পা্বে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্নের যে প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ আমাদের ছিল তা আমরা হারাতে বসেছি। অথচ জলবায়ু তহবিল এর ব্যাপারে আমাদের শাসকদের যত দৌড়ঝাঁপ, উষ্মা তার ছিটেফোটাও কি এসব বিষয়ে দেখা যায়?
আর জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতির বিরুদ্ধে আরেক রক্ষাকবচ সুন্দরবন, যা লোনা পানির অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে, বড় বড় ঘূর্ণঝড়ের ভয়াবহতা বুক পেতে নিয়ে আমাদের কৃষিকে, আমাদের জীবনকে রক্ষা করছে। তার ক্ষতি হবে জেনেও আমাদের শাসকরা রামপাল প্রকল্প করতে বদ্ধ পরিকর। সেখানে পানির তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে এই কথায় এমন ভাব করছেন যেন তা কিছুই না। তাদের এ ধরনের মনোভাবের পেছনে কি এটাই কারণ যে রামপাল বা ফারাক্কা ভারতের প্রকল্প? কারণ যাই হোক এধরনের উন্নাসিকতা আর প্রকৃতি বিরোধী মনোভাব নিয়ে সুন্দরবনকে তো বটেই আমাদের নিজেদেরও রক্ষা করতে পারব না।