আবুল হাসান রুবেল

লেখক: গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য

বাংলাদেশে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করার এবং সুন্দরবন রক্ষায় আন্দোলন চলছে। এ আন্দোলন বাংলাদেশে যেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তেমনি দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় তা সাড়া ফেলেছে। আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক দাবি এখন পর্যন্ত সুন্দরবনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র না করায় সীমাবদ্ধ থাকলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে আরো বহু প্রশ্ন এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। সেটা কখনো বিরোধী পক্ষের প্রশ্ন, প্রচারণার কারণে আবার অনেকখানিই আন্দোলনের বিষয়বস্তু এবং সামগ্রিকভাবে তার সঙ্গে গোটা ব্যবস্থার যুক্ততার কারণে। যেমন— প্রকৃতি ও উন্নয়ন প্রশ্ন, জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রশ্ন ইত্যাদি। বহু মানুষ চিন্তাগতভাবে এ প্রশ্নগুলো নিয়ে সক্রিয় হয়েছেন, এটা আন্দোলনের বাড়তি লাভ। এ সময়ে দুনিয়াজুড়ে জ্বালানি প্রশ্নটা একটি বড় রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন সরকার আর এনজিওগুলোর বিষয় হিসেবেই মূলত চিত্রিত হয়। সেখানে সাধারণ জনগণ, বিদ্বত্সমাজ বা পরিবর্তনকামী রাজনীতিক খুব কমই মনোযোগ দিয়েছে। সুন্দরবন আন্দোলন এ বিষয়েও মনোযোগকে সামান্য হলেও আকর্ষণ করতে পেরেছে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তন সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার কী বদল দাবি করে তা দুনিয়াজুড়েই উপেক্ষিত। এ বিষয়গুলো আসলে এক আলোচনায় সমাধা করে দেয়ার মতো নয়। বরং আলাপ-আলোচনা চলবে, মত-ভিন্নমত থাকবে, তার ভেতর দিয়েই একটা জায়গায় আমাদের পৌঁছতে হবে। এ লেখায় জ্বালানি প্রশ্নকে কেন্দ্রে রেখে আলোচনা করা হয়েছে, অন্য বিষয় এসেছে কেবল প্রসঙ্গক্রমে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জ্বালানি নিয়ে দুনিয়া যে রূপান্তরের মুখে, তাতে সবচেয়ে বড় বাধা এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি; বিশেষ করে কয়লা কোম্পানিগুলো। কারণ এ রূপান্তরের খাঁড়াটা প্রাথমিকভাবে তাদের ওপরই পড়ছে। আসলে দুনিয়াজুড়ে কয়লা কোম্পানিগুলো, বিশেষত কয়লা লবি এখন ভালোই বিপদে আছে। প্যারিসে জলবায়ু সম্মেলন চলাকালে কার কোম্পানি ভলভো ন্যাশনাল মাইনিং অ্যাসোসিয়েশন (এনএমএ) ছেড়ে বেরিয়ে আসে হঠাৎ করেই। আরেক বড় কয়লা লবি গ্রুপ আমেরিকান কোয়ালিশন ফর ক্লিন কোল ইলেকট্রিসিটি (এসিসিসিই) তার বেশকিছু প্রধান সদস্য হারায় ২০০৯ সালে। এই হারানো অব্যাহত আছে। এনএমএ ও এসিসিসিই ২০টিরও বেশি সদস্য হারিয়েছে গত কয়েক বছরে। একইভাবে লন্ডনে অবস্থিত কয়লার বৈশ্বিক লবি গ্রুপ ওয়ার্ল্ড কোল অ্যাসোসিয়েশনও তাদের পাঁচের অধিক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হারিয়েছে গত কয়েক বছরে। ভলভো ও ডিউক এনার্জি সরাসরি জানিয়েছে, তারা কয়লা লবির জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক বিলের বিরোধিতার সঙ্গে একমত নয় এবং সে কারণেই সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে। ডিটিই এনার্জি জানিয়েছে, তারা এখন জ্বালানির বহুমুখীকরণে আগ্রহী এবং তাদের স্বার্থের সঙ্গে এখন আর কয়লা লবির তেমন সম্পর্ক নেই। আবার বেশকিছু কোম্পানি অন্য কারণ না জানিয়ে তাদের বার্ষিক মূল্যায়নে প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। কয়লা লবি গ্রুপগুলো বহু বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় যেকোনো বিলের ব্যাপারে বিরোধিতা করে আসছিল এবং সেজন্য তারা কংগ্রেস সদস্য কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের অর্থ জুগিয়ে আসছিল। সাধারণভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকানরা, যুক্তরাজ্যে কনজারভেটিভরা এবং দুনিয়াজুড়ে স্বৈরশাসকরা এ লবির সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রে আবদ্ধ। দুনিয়াজুড়ে যুদ্ধ-দখল, রক্ষণশীল রাজনীতি, অভিবাসীবিরোধী আইন, মানুষের স্বাধীনতা হরণকারী আইন, পরিবেশ বিধ্বংসী তত্পরতা ইত্যাদির পেছনে কোলসহ ফসিল ফুয়েল লবির বড় ভূমিকা আছে। এরা টাকা দিয়েছে, প্রভাব বিস্তার করেছে কিন্তু সিদ্ধান্ত তো নিয়েছে আসলে রাষ্ট্র-রাজনীতি। কিন্তু বিপদের দিনে কেউই তাদের দায় নিতে রাজি নয়। অনেকটা নিজাম ডাকাতের গল্পের মতো। ডাকাতি করে যাদের খাইয়েছে, তারা কেউই আর তার পাপের দায় নিতে রাজি নয়। কয়লা লবির ইউরোপীয় প্রধান রিকেটস তাই উষ্মা ও ক্ষোভের সঙ্গে বলেছে, ‘ভবিষ্যতে কয়লা কোম্পানি দাস ব্যবসার মতোই ঘৃণ্য বলে বিবেচিত হবে।’ যদিও তার মতে, অবশ্যই ভুল কারণে। তবে ক্ষোভে-দুঃখে অনেক সময় সবচেয়ে সত্য কথাটা বের হয়ে আসে। এক্ষেত্রেও হয়তো সেটাই ঘটেছে। দুনিয়াজুড়ে কয়লা কোম্পানির এ দুরবস্থায় তো খুশি হওয়ার কথা প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষায় যারা কাজ করেন তাদের সবার। কিন্তু ততটা খুশি হতে পারছি কই? পরিস্থিতির এ দিকটার সঙ্গেই যে আরেকটা দিকও যুক্ত, সেটাই আসলে খুশি হতে দিচ্ছে না।

পরিস্থিতির আরেকটা দিক হচ্ছে, কয়লা কোম্পানিগুলো এত সহজেই মাঠ ছেড়ে দেবে না। সবাই নিজাম ডাকাত থেকে নিজামউদ্দিন আউলিয়া হয়ে যাবে না, যায় না। পিবডি এনার্জির মতো বড় বড় কোম্পানি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় উদ্যোগগুলো থামিয়ে দিতে। ট্রাম্পের মতো প্রার্থীর পেছনে জড়ো হবে কয়লা লবি। দুনিয়াজুড়ে রক্ষণশীল আর স্বৈরশাসনের একটা ঢেউ তারা নতুন করে তুলতে চাইবে। আর তার সঙ্গে নতুন বাজার খুঁজবে। তাদের নিজেদের দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র কমাতে বাধ্য হলেও হাল ছাড়বে না। নিজেদের দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র কমিয়ে ফেলতে বাধ্য হলে তারা এমন জায়গা খুঁজবে যেখানে পরিবেশ আইনে বা তা পালনে বড়সড় ফাঁকফোকর আছে, যেখানে কার্যকর গণতন্ত্র নেই, সরকার জনগণের কথা শোনে না বা তার প্রয়োজন বোধ করে না, যেখানে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। আর বাংলাদেশ এ ধরনের বিনিয়োগের জন্য উর্বর ক্ষেত্র হয়েই আছে। এক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের চেয়েও বাংলাদেশে এ বাজার খোঁজা বেশি হবে চীন ও ভারতের কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে। এ দুই দেশের ওপরও এখন কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপ আছে, কেননা তারা এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন শক্তি এবং কার্বন নিঃসরণেও সামনের সারিতে। এ দুই দেশই বাংলাদেশের নিকট-প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশের ওপর তাদের প্রভাব অন্য দেশগুলোর চেয়ে বেশি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি তারা এখানে বাজার খুঁজে পায় তাহলে ক্ষতি কী? বিদ্যুৎ তো আমাদের দরকার, তাতে পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি যদি একটু-আধটু হয়ও সমস্যা কী? অনেকে আরো একধাপ এগিয়ে বলেন, এত দিন ওরা গ্লোবাল ওয়ার্মিং করেছে, এখন আমরা করি না একটু! আমরা কি উন্নয়ন বন্ধ রাখব? আসলে এ যুক্তিগুলো কিন্তু আমাদের যারা ক্ষতি করেছে, তাদের শেষ মুনাফাটাও করে নেয়ার সুযোগ করে দেয়। তাকে আপাত যতই জাতীয়তাবাদী, উন্নয়নকামী, দেশপ্রেমিক মনে হোক না কেন। ফ্রাঞ্জ ফানো তার ‘রেচেড অব দি আর্থ’-এ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা হচ্ছে— উপনিবেশিত উপনিবেশকারীর মতো হতে চায়, নিপীড়িত নিপীড়কের মতো হতে চায়। তাতে অবশ্য কখনই মুক্তি মেলে না। আমরা আমাদের নিজেদের পরিবেশ ধ্বংস করে আসলে কার ওপর প্রতিশোধ নিতে চাইছি? কার সমান হতে গিয়ে আমরা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছি? গ্লোবাল ওয়ার্মিং ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে সবচেয়ে আগে তা কাকে আঘাত করবে? কয়লা বিদ্যুতের পক্ষে যুক্তি দেয়ার সময়, উন্নয়নের স্বার্থে পরিবেশের ধ্বংস মেনে নেয়ার যুক্তি দেয়ার সময় এ বিষয়গুলো আমাদের ভাবা জরুরি শুধু নয়, অপরিহার্য।

গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে বাংলাদেশ তলিয়ে যাবে— এটা এখন বেশ প্রচারিত ধারণা। কিন্তু সেটা কোন এক সুদূর ভবিষ্যতে ঘটবে এবং তা নিয়ে এখনই ভাবাভাবির তেমন কিছু নেই— এটাও জনমানসের ধারণা। আবার কিছু ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল এবং সরকার ও এনজিওগুলোর বিভিন্ন অভিযোজন-বিষয়ক তত্পরতায় বাংলাদেশে অনেক পরিবর্তনকামী মানুষের ভেতরেও এ নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন জলবায়ু সন্দেহবাদ থেকে যা গুণগতভাবেই ভিন্ন। এর উত্স যেমন একদিকে সরকার ও এনজিওগুলোর সাধারণ তত্পরতায় তাদের অনাস্থা আর জলবায়ু তহবিলকেও লুটপাটের আরেকটা ক্ষেত্রে পরিণত করা, তেমনি তলিয়ে যাওয়া বিষয়ে অতি প্রচার এবং বাস্তবে তলিয়ে না যাওয়া। আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব ঘটনা ঘটবে এর অনেকগুলোই আমরা প্রত্যক্ষ করছি এরই মধ্যে। ঋতুচক্রের পরিবর্তন, ঋতুর বৈচিত্র্য কমে যাওয়া, শীত-গরমের তীব্রতা বৃদ্ধি, সাধারণভাবে তাপমাত্রা বাড়া, অসময়ে বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি এখন বাংলাদেশে আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। কিন্তু সেগুলোকে আমরা কখনই আলোচনায় আসতে দেখি না। এ প্রভাবগুলো এখন আমরা যেভাবে দেখতে পাচ্ছি, ততটা অনুল্লেখ্য বা নিরীহ আর থাকবে না যখন তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি বাড়বে। এর সঙ্গে আমাদের পরিবেশের অন্যান্য ধ্বংসযজ্ঞ যুক্ত হয়ে যেখানে দাঁড়াবে তা আমাদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে দেবে।

তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়া এখনো কয়েক দশক দেরি আছে, তাই সেটা নিয়ে ভাবতে অনেকে অনাগ্রহী। আচ্ছা বাদ দেন, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়াটা ঠেকানোর সম্ভাবনা শূন্য আর তা যে খুব শিগগিরই ঘটবে— এটি সবাই মেনেই নিয়েছেন। সেক্ষেত্রে আসলে তার কী প্রভাব পড়বে? সাধারণভাবে ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি মানুষের ত্বকে তেমন কোনো আলাদা অনুভূতিই তৈরি করে না। কিন্তু আমরা মানুষের চামড়ায় এর প্রভাব বিষয়ে আলোচনা করছি না, আলোচনা করছি পৃথিবীর ভূভাগজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলাফল নিয়ে। পৃথিবীতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফল হতে পারে মারাত্মক জলবায়ুগত পরিবর্তন। কী হবে তার অনেকটাই বোঝা যাবে সাড়ে ৬ হাজার বছর আগে যখন পৃথিবীর তাপমাত্রা এখনকার চেয়ে ১ ডিগ্রি বেশি ছিল সে সময়ের দিকে নজর ফেরালে। সে সময় এখনকার যা কৃষিজমি, তার বড় অংশই ছিল বালুকাময় মরুভূমি। ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়লে (তার চেয়ে একটুও বেশি না বাড়লে) ২১০০ সাল নাগাদ দুনিয়ার এক-তৃতীয়াংশ স্বাদু পানির আধার শুকিয়ে যাবে। আর উষ্ণতর অঞ্চলের চেয়ে মেরুতে তাপমাত্রা বাড়ছে অনেক দ্রুতগতিতে। ফলে ৪০ বছরে আর্কটিকে ৪০০ ঘনকিলোমিটার বরফ গলেছে। হাজার বছর ধরে তুষারীভূত মৃত্তিকা গলে কাদা ও পানিতে পরিণত হওয়ার ফলে উপড়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট; পাইপলাইন ধসে যাচ্ছে। মেরু ভল্লুক উঁচু থেকে আরো উঁচুতে উঠে যাচ্ছে। আগেভাগেই বরফ গলার মানে হলো, সূর্যের কিরণকে যা প্রতিফলিত করে, তা বরফ আর করতে পারবে না। পার্শ্ববর্তী সাগরে তা শোষিত হবে আর দুনিয়ার তাপমাত্রা বেশি বেশি করে বাড়াবে। পরের বছর বরফ জমাকেও তা প্রতিহত করবে। সাধারণভাবে যাকে স্থায়ী তুষারাবৃত এলাকা বলে ধরা হয়, এ রকম ৭ লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চলের এক বছরের মধ্যেই গলে যাওয়া প্রক্রিয়াটি কত দ্রুত ঘটছে তারই বহিঃপ্রকাশ। এর প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে পর্বতমালায়ও। আল্পসের তিন হাজার মিটারের ওপরটা স্থিতি লাভ করেছে তুষারীভূত মাটির মাধ্যমে। ২০০৩ সালে এর ৪ হাজার ৮০০ মিটার পর্যন্ত গলন পৌঁছে যায়। এ গলনের ফলে পাথর, কাদামাটির স্রোতে ৫০ জন পর্বতারোহী মারা যান, বাকিরা পালিয়ে বাঁচেন। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়তেই থাকলে শুধু পর্বতারোহী নয়, পালাতে হবে আশপাশের গ্রাম-শহরের মানুষকেও। অন্যদিকে নিচুতে সমুদ্র উপকূলের দেশগুলোর জন্য অপেক্ষা করছে আরেক ধরনের ভবিষ্যৎ। মালদ্বীপকে হয়তো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে তলিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। পূর্ব যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো উপসাগর, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, বঙ্গোপসাগর ঘন ঘন তীব্র মাত্রার ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস দ্বারা আক্রান্ত হবে। আর এ ধরনের চরম পরিস্থিতিতে মানুষ কীভাবে আচরণ করে তার নমুনাও আমরা হারিকেন ক্যাটরিনার সময় দেখেছি। সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার করে দ্রুত খাবার দিয়ে পালাচ্ছে, একটা জায়গায় গাদাগাদি করে মলমূত্রের মধ্যেই মানুষ বাস করছে, যে সামান্য খাদ্য বা পানি পাওয়া যাচ্ছে তা একটা যুবকদের দঙ্গল, যাদের হাতে অস্ত্র আছে, তারাই ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অসুস্থ, বৃদ্ধ, শিশু, নারীরা প্রায় কিছুই পাচ্ছে না। এটা হলো আমেরিকান একটি নগরের চিত্র, তৃতীয় বিশ্বে শরণার্থী শিবিরগুলোর পরিস্থিতি যে এর চেয়ে ভালো হবে না— তা বলা বাহুল্য।

এগুলো তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেই ঘটবে। কিন্তু যদি তা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে তাহলে আসলে কী ঘটবে? এর তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে— এর একটা উদাহরণ দেখা গেছে ২০০৩ সালে ‘ইউরোপিয়ান হট সামারে’। এই গতিতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সাল নাগাদ এ ধরনের তাপপ্রবাহ হয়ে যাবে বার্ষিক সাধারণ ঘটনা। এ ধরনের তাপপ্রবাহে প্রথম দিকে তেমন বড় কোনো লক্ষণ থাকে না। একটু দমবন্ধ ভাব, মাথা ঘোরা আর বিরক্তিকর অনুভূতি হয়। কিন্তু যখনই শরীরের তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছে তখন তার তাপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে থাকে। নিঃশ্বাস ছোট ও দ্রুত হয়ে আসে, ঘাম বন্ধ হয়ে যায়। হূদস্পন্দন দ্রুত হয়ে আসে। খুব দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মস্তিষ্ক অক্সিজেনের অভাবে কাজ করা বন্ধ করতে শুরু করে, গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়, মৃত্যু তার পর আর কয়েক মিনিটের ব্যাপার মাত্র। এ তাপপ্রবাহে ইউরোপজুড়ে মারা যায় ২২ থেকে ৩৫ হাজার মানুষ। কৃষির ক্ষতি হয় ১২ বিলিয়ন ডলারের। কিন্তু এসব তাত্ক্ষণিক ক্ষতি আসলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির তুলনায় প্রায় কিছুই না। এ অবস্থা তুলনীয় ১ লাখ ২৫ হাজার বছর আগের পৃথিবীর সঙ্গে, যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এখনকার চেয়ে পাঁচ-ছয় মিটার বেশি ছিল। সমুদ্রের পানি তাপমাত্রা কমার সঙ্গে মেরু অঞ্চলে বরফ হয়ে জমেছে। এখন এই তুষার গলতে শুরু করেছে। পূর্বাভাস বলছে, গ্রিনল্যান্ডের সব বরফ গলবে তাপমাত্রা ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে। কিন্তু মার্ক লাইনাস বলছেন, গ্রিনল্যান্ডে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ২ দশমিক ২ গুণ বেশি হারে। অর্থাৎ ১ দশমিক ২৩ সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লেই তা গলে যাবে। এর প্রভাব সব উপকূলবর্তী অঞ্চল তলিয়ে যাওয়া। এখন যেমন ইউরোপ থেকে লোকে ভূমধ্যসাগরে বেড়াতে আসে, তখন কেউই আসবে না। আসতে পারবে না। কারণ ভূমধ্যসাগরে তখন সাহারার মতো তাপপ্রবাহ থাকবে। আর সাহারা সব ধরনের জীবনেরই অনুপযোগী হয়ে যাবে। শুধু এসব অঞ্চলেই নয়, প্রভাব পড়বে আমাদের অঞ্চলেও। পর্বতশৃঙ্গগুলো তার হিমবাহ হারাবে। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশ পুরোটাই অস্তিত্বের জন্য লড়বে। যে বিশাল নদীগুলোর ওপর এখানকার সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো আর বরফগলা পানিতে নবায়িত হতে পারবে না। গোটা এলাকায় পানির অভাবসহ কৃষি উত্পাদনের সংকটে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। এর শুরুটা হবে পাকিস্তান থেকে, এর পর পুরো এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়বে।

সূত্র : বণিকবার্তা