প্রশান্ত ত্রিপুরা
মুক্ত গবেষক; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক।

২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধ জনপদের উপর যে অভাবনীয় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল, যার ফলে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় স্থাপনাসহ অনেক বাড়িঘর ধ্বংস হয়, ধূলিসাৎ হয়ে যায় বহু প্রজন্ম ধরে লালিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে রামুবাসীর গর্ব– ২৯ সেপ্টেম্বর সে কলঙ্কময় দিবসের বর্ষপূর্তি।

ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জায়গা থেকে সচেতন নাগরিকদের অনেকে তাই রামুতে সমবেত হচ্ছেন এক বছর আগে আক্রমণের মুখে পড়া মানুষদের প্রতি সংহতি জানাতে, ন্যায়বিচারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করতে এবং মানবিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক চেতনা তুলে ধরতে।

এদিকে ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৩ তে শেষ হয়েছে ঢাকা থেকে রামপাল অভিমুখে পরিচালিত লংমার্চ, যা আয়োজিত হয়েছে সুন্দরবন সংলগ্ন এই জায়গায় পরিকল্পিত একটি কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রতিবাদে। সচেতন মহলের আশঙ্কা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ বিপন্ন হবে এবং অর্থনৈতিকভাবেও তা এদেশের স্বার্থানুকূল হবে না। স্বভাবতই তাদের অনেকে সরব হয়েছেন প্রতিবাদে, তৎপর হয়ে উঠেছেন প্রতিরোধে।

রামু আর রামপাল উভয় জায়গাই সীমান্ত-সংলগ্ন এবং একভাবে উভয়ই হয়ে উঠেছে জাতীয় স্বার্থের বিপন্ন সীমান্তের প্রতীক। রামপাল যেমন হয়ে উঠেছে হুমকির মুখে পড়া অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতীক, তেমনি একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, রামুতে যেসব বিষয় আক্রান্ত হয়েছিল, ধূলিসাৎ হয়েছিল– বিরল সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও অসাম্প্রদায়িকতার স্থানীয় ঐতিহ্য-– সেসবও ছিল অমূল্য জাতীয় সম্পদ।

জাতীয় স্বার্থের এ অভিন্ন যোগসূত্রটা যারা দেখতে পান, তাদের কাছে রামু এবং রামপাল উভয় জায়গাই তাই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের একেকটা সীমান্ত ঘাঁটি।

উপরের পর্যবেক্ষণের আলোকে এটা অনুমেয় যে, যারা রামপাল-অভিমুখী লংমার্চে অংশ নিয়েছেন, তাদের সঙ্গে রামুতে সমবেত হওয়া মানুষদের চিন্তাভাবনা বা মতাদর্শের মিল থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বাস্তবেও তেমনটিই দেখা যায়। যেমন, লংমার্চের নেতৃত্ব দানকারীদের অন্যতম একজন, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সপ্তাহ খানেক আগে রামু সহিংসতার উপর প্রকাশিত একটি সংকলনের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

রামু এবং রামপাল এই উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের জনগণের সচেতন অংশের মধ্যে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের যে মাত্রা, দৃঢ়তা ও স্বতস্ফূর্ততা লক্ষ্য করা গেছে, তা অবশ্যই খুব তাৎপর্যপূর্ণ ও উৎসাহব্যঞ্জক। উভয় বিষয় নিয়েই যেহেতু বেশ লেখালেখি হয়েছে, হচ্ছে, আমি ‘জাতীয় স্বার্থের সীমান্ত’ ধারণাটার উপর আলোকপাত করব প্রাসঙ্গিক একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে, যা এ ধরনের প্রেক্ষিতে সচরাচর নজরের আড়ালে থেকে যায়। দৃষ্টিকোণটা হচ্ছে এদেশে যারা ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের দাবিদার, সেই ‘জাতিগত সংখ্যালঘু’দের।

এক বছর আগে রামুতে যে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে বড়ুয়া ও রাখাইন-– এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। বড়ুয়াদের সংখ্যাই বেশি ছিল এবং তাদের বর্তমান জাতিগত পরিচয় যেহেতু বাঙালি (অতীতে একসময় তাদেরকে ‘মগ’ বর্গভুক্ত হিসাবেও দেখা হত)– রামুর সহিংসতাকে অনেকে দেখেছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ‘অসাম্প্রদায়িক’ আদর্শের প্রতি একটা আঘাত হিসাবে। বিশেষ করে শান্তিপ্রিয় ও নির্বিরোধ বলে বড়ুয়াদের একটা পরিচিতি গড়ে উঠেছে। কাজেই বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের অনেকের কাছেই রামুর সহিংসতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো ছিল না।

তবে রামুর ঘটনার বাঙালি-কেন্দ্রিক ভাষ্যের কিছু অনুচ্চারিত দিক যে গোলমেলে ছিল, তা অনেকে হয়তো খেয়ালই করেননি। যেমন, প্রথমত, এতে রাখাইনরা চলে গিয়েছিল দৃষ্টির আড়ালে। দ্বিতীয়ত, ‘বড়ুয়াদের মতো শান্তিপ্রিয় সম্প্রদায়ের উপর আঘাত বরদাশ্‌ত করা যায় না’-– এমন কথার পেছনে প্রচ্ছন্নভাবে বুঝি-বা এটা বলা হচ্ছে যে, ‘পাহাড়িদের উপর হামলার পেছনে কিছু যুক্তি আছে’! (উল্লেখ্য, রামুর সহিংসতার ঠিক এক সপ্তাহ আগে রাঙামাটিতে পাহাড়িদের উপর আক্রমণ পরিচালিত হয়েছিল, যে ঘটনাকে তখন বেশিরভাগ পত্রপত্রিকায় ‘পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষ’ হিসাবে প্রচার করা হয়েছিল!)

রামপালে বা সুন্দরবন-সংলগ্ন অঞ্চলে আদিবাসীদের বসবাস কোথায় কতটা আছে, আমার ঠিক জানা নেই। এ ব্যাপারে রামপালের বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরতদের কাছে কোনো তথ্য আছে কি না, তাও জানি না। ব্যক্তিগতভাবে আমি এইটুকু জানি, নিজেদের আদিবাসী মনে করেন, এমন অন্তত দু’একটা জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে সুন্দরবন-সংলগ্ন অঞ্চলে।

যেমন বাগেরহাট-নিবাসী একজন ব্যক্তি রয়েছেন, যার সঙ্গে ঢাকায় কোনো এক আদিবাসী-বিষয়ক অনুষ্ঠানে বছর তিনেক আগে আমার পরিচয় হয়েছিল, যিনি মাঝে মধ্যে আমাকে ফোন করেন এবং বলেন, তারা, বাগেরহাটের আদিবাসীরা, খুব কষ্টে আছেন।

দেশের সর্বত্র আদিবাসীরা তাদের কৃষিভূমি থেকে উৎখাত হয়ে চলছে, বনভূমির উপর তাদের প্রবেশাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, এটা নূতন কোনো কথা নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে কীভাবে এক লক্ষের মতো মানুষ (যাদের সিংহভাগ ছিল পাহাড়ি) বাস্তুচ্যুত হয়েছিল, পুরো অঞ্চলের চল্লিশ শতাংশ প্রথম শ্রেণির আবাদযোগ্য ভূমি তলিয়ে গিয়েছিল, সে ইতিহাস অনেকের জানা আছে।

এদিকে সম্প্রতি ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উঠানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যে জনপ্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, সেখানে স্থানীয় আদিবাসীদের একটা বিশেষ ভূমিকা ছিল। তবে ফুলবাড়ি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যে ধরনের সংবাদ বা বিভিন্ন মতামত ও বিশ্লেষণ পরিবেশিত হয়েছে, তাতে ‘আদিবাসী’দের প্রতি আলাদা করে খুব একটা আলোকপাত করা হয়েছে, এমনটা আমার চোখে পড়েনি।

আসলে, এমন একটা সময় আমরা অতিক্রম করছি, যেখানে ক্ষমতাসীন মহলে ‘আদিবাসী’ ধারণাটাকেই দাঁড় করানো হয়েছে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হিসাবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যারা প্রথাগতভাবে শ্রেণির ধারণার উপরই বেশি নির্ভর করেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় ‘আদিবাসী’ প্রত্যয়ের প্রয়োগকে তাদের সবাই সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি এখনও। এ ধরনের একাধিক কারণের ফলে ‘আদিবাসী’ হিসাবে নিজেদের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী জনগোষ্ঠীরা বিভিন্নভাবে ‘জাতীয় মানসে’ (বা ‘জাতীয়’ হিসাবে চিহ্নিত অন্যান্য বলয়ে) প্রান্তিক রয়ে গেছে।

উপরের বক্তব্যের সমর্থনে দু’একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। যেমন, সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর লাশের ছবি এবং ভারতে চলমান তার হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া এদেশের মানুষদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে সঙ্গত কারণেই। তবে গত মাসে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে প্রবেশের পর দুজন বাংলাদেশি আদিবাসী কিশোরের নিহত হওয়ার খবর নিয়ে তেমন হৈ চৈ হয় নি সংবাদ মাধ্যমে।

একইভাবে, বাঙালি বুদ্ধিজীবী মহলে গত বছর রামুর ঘটনা যতটা আলোড়ন তুলেছিল, আত্ম-সমীক্ষার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল, রামুর এক সপ্তাহ আগে ঘটে যাওয়া রাঙামাটির সহিংসতা বা গত মাসের তাইন্দং-এর ঘটনা, সেভাবে সাড়া জাগিয়েছে বলে মনে হয়নি।

ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখি, বাংলা অঞ্চল-– বিশেষ করে পূর্ব বাংলা-– একসময় দিল্লি-কেন্দ্রিক বিভিন্ন সাম্রাজ্যের জন্য ছিল রাজনৈতিকভাবে ‘সীমান্ত’ প্রদেশ। তবে অঞ্চলটি অন্যান্য অর্থেও– সাংস্কৃতিকভাবে এবং কৃষি-প্রতিবেশগত বিবেচনায়– ছিল সীমান্ত স্বরূপ।

আর্য সংস্কৃতির ধারক-বাহকদের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা ছিল অনেকটাই অনার্য-অধ্যুষিত এলাকা এবং এ অঞ্চলের আদিবাসীরা এখনও অনেকাংশে সেই অনার্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিরকার বয়ে চলছে। বাঙালি মুসলমান কৃষক সমাজের আবির্ভাবও ঘটেছে প্রধানত এ ধরনের বিভিন্ন ‘আদিবাসী’ জাতির সংমিশ্রণেই।

মুগল আমলে পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলকে আবাদী ভূমিতে রূপান্তরিত করার কাজে পরোক্ষভাবে একটা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন সুফি ভাবধারার পীর-দরবেশগণ, যাদের মাধ্যমে ইসলাম এ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

এসব ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার সুযোগ এই নিবন্ধের পরিসরে নেই, তবে সংক্ষেপে এটির অবতারণা এখানে করেছি এজন্য যে, একটি আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের আবির্ভাবের পর, দিল্লি বা কলকাতার একসময় যে ভূমিকা ছিল পুরো পূর্ব বাংলার প্রেক্ষিতে, ঢাকা এখন সে ভূমিকা পালন করছে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল (সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, গড়াঞ্চল, বরেন্দ্রভূমি ইত্যাদি) এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের (আদিবাসী, কৃষক, জেলে, বাওয়ালি, মাওয়ালি ইত্যাদি) বেলায়। ঢাকায় ক্ষমতার মসনদে বসে যারা জাতীয় স্বার্থের কথা বলেন, তাদের হিসাব-নিকাশে আদিবাসীদের স্বকীয়তা বা সুন্দরবনের বিশেষত্ব অমূল্য কোনো সম্পদ নয়।

সময় হয়েছে, জাতীয় স্বার্থের সংজ্ঞার্থ ও সীমান্ত নূতন করে ঢেলে সাজানোর, যেখানে একসূত্রে গাঁথা থাকবে রামু, রামপাল, তাইন্দং এবং এমন আরও বহু প্রত্যন্ত জায়গার নাম এবং ফেলানীর মতো করেই জাতীয় মর্যাদার বিষয় মনে করে দেশবাসী উচ্চারণ করবে আরও অনেকের নাম।

হেমন্ত, শীতল (গতমাসে সীমান্ত পার হওয়ার পর ভারতের মাটিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া দুজন কোচ কিশোর), সুজাতা, সাগরি (মে ২০১২-তে ধর্ষকদের হাতে যথাক্রমে লংগদু ও নওগাঁয় নিহত আদিবাসী শিশু) বা আদুরি (ঢাকায় সম্প্রতি ডাস্টবিন থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধারকৃত এক নির্যাতিত শিশু গৃহকর্মী)-– যারা প্রতিনিয়ত মৃত্যু ও নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছে ‘জাতীয় স্বার্থে’র কোনো না কোনো অরক্ষিত সীমান্তে।