আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি ।।

 

হুমায়ুন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে সবাই সারাদিন নুহাশ পল্লীতে ছিলো। মিছির আলী, শুভ্র , বাকের ভাই, মুনা, রুপা, বদি, মাজেদা খালা, বড় চাচা, কঙ্কা, তিতলী, কুত্তাওয়ালী…। কিন্তু হিমু যায়নি। এইসব জন্মদিন নিয়ে তাকে মাথা ঘামালে চলবে না। তার অনেক কাজ অনেক দায়িত্ব।
সকালে শাহবাগ মোড় থেকে কিছু ফুল কিনেছিলো হিমু। পরিচিত দোকানদার বললো, হিমু ভাইজান কি হুমায়ুন স্যারের জন্মদিনে ফুল দিতে যাচ্ছেন? হিমু হাসি হাসি মুখ করে বললো নাহ। খাবো। লাল গোলাপ গুলো শুকনো মরিচ দিয়ে ঝালঝাল করে ভাজি করবো, আর সাদা গোলাপ চিংড়ি মাছ দিয়ে রান্না হবে মাখা মাখা করে। তোমার দাওয়াত চলে এসো। দোকানদার মলিন মুখে বললো হিমু ভাই খালি মস্করা করেন আমার সাথে। হিমু আর কোন উত্তর না দিয়ে হেটে হেটে চলে এলো একটি বিশেষ থানায় (থানার নাম উল্লেখ করা নিষেধ আছে)। থানার ওসি প্রকাশ্যে এমন ভাব নেয় যেন এখনই হিমুকে ধরে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে যাবে। কিন্তু হিমু জানে সে তাকে ভীষন পছন্দ করে। কারন ভালোবাসা টের পাওয়া যায়।

হিমু ওসি সাহেব কে বললেন ভাই আপনি আমাকে পুলিশ হেড কোয়াটারে নিয়ে যান নাইলে ভাবীর কাছে গিয়ে বলবো ফুলের দোপেয়াজো করে দেন আমি আর রফিক ভাই খাবো। ওসি সাহেব ঝিম খেয়ে বসে আছেন। সে জানে হিমু যখন বলেছে সে যাবেই। তাকে না করা মানে আরেক বিপদ ডেকে আনা। আর তার আবদার পূরন করা মানেও বিপদ। ওসি বলছে, হিমু আমার চাকরিটা না খেলে হয় না? হিমু বললো কিচ্ছু করার নাই রফিক ভাই। আপনার চাকরিটা আমাকে খেতেই হবে। আমি ভীষন ক্ষুধার্থ। ওসি ভীতু মুখে হিমুকে নিয়ে রওনা দিলো। হিমু বের হতেই গেটের কনস্টেবল বললো, হিমু ভাই আমার ছেলেটারে নিয়ে আসছি ওরে একটু দোয়া কইরা দেন। হিমু বললো নামকি তোমার ? ছেলেটি ফিক করে হেসে বলে আমার নাম সাওগাদ। হিমু শুনলো সাওতাল! হিমু চমকে উঠে বললো- সাওতাল? কনস্টেবল বললো না ভাই সাওগাদ। হিমু বললো আমি দোয়া করি যদি কোনদিন তোমার ঘড় পুড়ে যায় তুমি যেন তার জবাব আদায় করেই বাঁচতে পারো। তোমার পাশে যেন তখন অসংখ্য মুখ দাড়িয়ে যায় । কনস্টেবল বললো- এ কেমন দোয়া হিমু ভাই? হিমু বললো ভাইরে আপাতত এরচেয়ে বেশি কিছু নাই মাথার ভেতর…। ভালো কিছু আসলে তোমাকে জানাবো। তবে এটা খুব জরুরী দোয়া এই সময়ে।
হিমু পলিশের এক বড় কর্তার সামনে বসে আছে। চশমার ফাক গলে বড় কর্তা ওসিকে বললো, রফিক তাহলে এই তোমার সেই আধ্যাত্মিক পুরুষ। ওসি মিনমিন করে বললো জ্বি স্যার…। কর্তা বললেন তা বলুন মহাপুরুষ সাহেব আপনি সবার আবদার পূরন করে আমার কাছে আবার কি প্রয়োজনে ?
হিমু পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে বললো স্যার আমি এই সিগারেটটা খেতে চাই। আপনার সাহায্য দরকার। এ কথা শুনে সবাই থ হয়ে গেলো। বড় স্যার এবার নিরবতা ভেঙ্গে বললেন কি সাহায্য করতে পারি? সিগারেট ধরিয়ে দিবো?
হিমু বললো না স্যার, আপনি আপনার বাহিনীকে হুকুম দেন কোন গরিব বাঙ্গালী বা আদিবাসী পল্লীতে আগুন লাগিয়ে দিক। আমি সেই আগুনে সিগারেট ধরাবো। তারপর ফেসবুকে একজন লাইভ সম্প্রচার করে ক্যাপশন দিবে- আদিবাসী পল্লী যখন পুরছিলো হিমু তখন সিগারেট ধরাচ্ছিলো।
কর্তা কঠিন স্বরে বললো তা পুলিশ বাহিনীকে কেন বেছে নিলেন আপনার ইচ্ছা পূরুনের জন্য? হিমু বলে, স্যার আগুন লাগাবে দুস্কৃতিকারীরা। পুলিশ তাদের পাহারা দিবে। ফেসবুকে দেখেছি আমি এমন দৃশ্য। তখন থেকেই ইচ্ছাটা জেগেছে মনে। তাই মনে হলো এমন নিরাপদ সাহায্য আর কোথায় পাবো পুলিশ বিনে।

এরপরের দৃশ্য যথারীতি হিমুর উপর এ্যাকশনে যেতে উদ্যতো হলো পুলিশ। বড় কর্তা তাকে সায়েস্তা করার নির্দেশ দিলেন। হিমু বললো স্যার মারার আগে আগুন জ্বালো আগুন জ্বালো একটা মিছিল করি একলা একলা। তখন এ্যাকশন শুরু হবে। রাবার বুলেট পছন্দ না আমার। টিয়ারসেল মারতে বলেন। আর জল কামানে কুসুম গরম পানি রাখলে ভালো হয় হালকা শীত পরেছে।
তখন এক কনস্টেবল কষে এক থাপ্পর মারলো হিমুর গালে। হিমু এবার হতভম্ব হয়ে গেলো। তার গালে থাপ্পর মেরে লোকটা দিব্যি দাড়িয়ে আছে! এখনো তার কিছু হয়নি। তার হাত ব্যথা বা পেট ব্যাথা তেমন কিছুও না…। পেছনে তাকিয়ে দেখে মিসির আলী রুপা বাকের ভাই ও মুনা এসেছে দুজন চিকিৎসক ও একজন উকিল নিয়ে। হিমুর মাথায় সমস্যা আছে এটা প্রমান করে ও ব্যাকডেটেড ভূয়া প্রেসক্রিপশন ( এই দেশে সব সম্ভব) শো করে হিমুকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।

বাকের ভাই হিমুকে বোঝাচ্ছে। হিমু দিন বদলে গেছে এবার চেঞ্জ হও। বিয়ে করো। হিমু বলে আপনে বিয়ে করেন মুনা আপারে। মিসির কাকারে বিয়া দেন। শুভ্ররে বিয়া করান। বদি ভাইরে আবার বিয়া দেন…। রুপা কাদছে। তার চোখে পানি। সে হিমুকে থাপ্পর মারার দৃশ্যটি দেখে সহ্য করতে পারেনি। সে জানে হিমু পরিবেশ হালকা করার জন্য এখন অনেক কথা বলবে। সে জানে হিমুর ভেতরও কান্না আছে। সেই কান্না প্রকাশের অনুমতি নেই বলেই হিমু এমন করে।

হিমু আস্তে করে রুপার পাশে এসে বললো রুপা স্যার যদি বেঁচে থাকতো আমি তার কাছ থেকে তোমাকে ভালোবাসি বলার জন্য অনুমতি নিয়ে আসতাম। সেই সুযোগ আমার নেই।
এবার হিমু সবাইকে প্রস্তাব করে, চলেন আমার থাবড়া খাওয়া দিবস উপলক্ষে সবাই মিলে নৌবিহারে যাই মরা বুড়ি বঙ্গায়। মিসির আলী বললো এই নোংড়া পানিতে নৌ বিহার? হিমু বললো হ্যা। এই বিষাক্ত পানি ধরে আমাদের নৌকা ভাসতে থাকবে। সারারাত সারাদিন ভাসবো। যতক্ষন না নদীকে তার স্বভাব মতো বইতে না দেখবো..যতক্ষন ভালো পানি না দেখবো অতোক্ষন ভাসবো।

ভাসতে হিমুদের নৌকা কোথায় পৌছে যায় কে জানে। মরা নদীর দেশে হিমুর অসুস্থ লাগে। অসস্তি লাগে। মিসির আলী জানে হিমু ওদের নিয়ে একটা খেলা শুরু করেছে। পাগলাটে ছেলেটা কোন এক অঙ্গীকার করিয়ে তবেই ছাড়বে। হয়তো উপন্যাসের চরিত্র থেকে বের করে জনস্রোত নামাবে রাস্তায়। এই আদিবাসী সাওতালদের জন্য, সুন্দরবনের জন্য বাংলাদেশের জন্য। মিসির আলী জানে এক বাকের ভাইয়ের নামেই এই দেশের তরুনরা পথে নেমে এসেছে মুহুর্তেই, সেখানে এতোগুলো চরিত্র এক সাথে ডাক দিলে কি ঘটতে পারে…!
মিসির আলী ভালো করেই জানে হুমায়ুন ভক্তরা কম পাগল না। প্রাণ প্রকৃতির এই সংকটের খবর শুনলে তারা সোচ্চার হবে, প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠবে মুহুর্তেই! এই প্রতিবাদ কণ্ঠ থেকে কণ্ঠে ছড়িয়ে পরবে । অসংখ্য হিমু রাস্তায় নেমে এলে আটকানো মুশকিল…দিন যতই কঠিন হোক।
মিসির আলী খেয়াল করলো শুভ্র বিড়বিড় করে বলছে- সুন্দরবন ধ্বংস করে বিদ্যুত কেন্দ্র চাইনা। জাতিগত নির্যাতন, রুখে দাড়াবে জনগন।

মুনা গান ধরেছে…আমার মাটি আমার আসল ঠিকানা… । বাকের ভাই বদিকে বলছে মহল্লার পোলাপানগো খবর দে… রেডি কর। মিছিলে নামবো…। হিমু মৃদু হাসছে…

সূত্রঃ ফেসবুক