ফিরোজ আহমেদ।।

45149_463145476564_6827191_n

দার্শননিক হেগেল বলতেন, যেমনি প্রজা, তেমনি রাজা। নাগরিকরা যেমন শাসনের যোগ্য, তেমনি শাসনই তারা পায়। খারাপ শাসনের তাহলে প্রতিকার কী?

এই প্রশ্নের উ্ত্তর খোঁজার আগে জাতীয় কমিটির মহাসমাবেশ সফল করতে নানান পর্যায়ে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাদের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। দিনের পর দিন যারা গণসংযোগ চালিয়েছেন, হেঁটেছেন পথে পথে, গিয়েছেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে, তাদের শ্রমেরই ফসল এই বিশাল জনসভা।

গণসংহতি আন্দোলনের সাথে যুক্ত সকল শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-শ্রমজীবী সকল নেতাকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীদেরও ধন্যবাদ জানাই। যতটুকু শ্রম তারা দিয়েছেন সুন্দরবনকে বাঁচাতে, ততখানি তারা জনগণের কাছ থেকে ফেরত পাবেন, এই ভরসা নিয়েই আমরা বাঁচি।

পাশাপাশি আর সকল রাজনৈতিক দল, গণসংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকেও ধন্যবাদ জানাই, জনসমাবেশে সাধ্যমত অংশগ্রহণে জন্য। এমনকি, এর বা্ইরেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে্ও অনেকেই খেটেছেন, ভূমিকা রেখেছেন, তাদেরও প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো যাক এই সুযোগে।

আজকের জনসভা নিশ্চয়ই সফল। কিন্তু, বিশেষ করে শেষ কদিনের গণসংযোগের অভিজ্ঞতার পর আপনাদের কি মনে হয়নি, আমরা সবাই যদি আরেকটু আগে থেকে, আরও পুঞ্জীভূত আকারে এই শ্রমটা দিতে পারতাম, এই মহাসমাবেশ ছাড়িয়ে জনতার ঢল নামতো ঢাকার বুকে! রাজনৈতিক দল আর সংগঠনগুলো যদি সুন্দরবনকে ঘিরে অন্তত মাস খানেক ধরে কাজ করতেন, নেতৃবৃন্দ যদি মানুষের কাছে যেতেন, মানুষ কি আরও বহুগুনে ভালবাসা ফেরত দিতো না?

আমাদের মনে হয়েছে। এই আত্মসমালোচনা নিয়েই মহাসমাবেশের কর্মসূচি শেষে ফিরছি। যতটুকু ফলাফলের উপযুক্ত কাজ হয়েছে, ততটুকু ফলই মিলেছে। তাই যা কিছু সাফল্যের পরও এই আসম্পূর্ণতাটুকু থাকলো, দৃষ্টিসীমার মাঝে অতিকায় মহাদেশ থেকেও দ্বীপে বিজয় করার মতই।

পুস্তক বাঁধাই শ্রমিকদের যে বড়সড় মিছিলটি দেখে খুশী হয়েছিলাম, তারা কিন্তু বেজার মুখে বললেন, যদি আর সপ্তা খানেক আগে আসতো সাকি ভাই, দুইশো পাঁচশো লোক এমনিতে আসতো। বেশিরভাগ শ্রমিক তো খবরই জানে না। মাত্র দুই দিন আগে জানাইলেন আমাগো, তাতে কাজ ফালাইয়া আমরা আসছি।

একজন কৃষক সংগঠক বললেন, এইভাবে হয়! দ্যাশের সবগুলা লঞ্চঘাট আর বাসঘাটে তো পোস্টার দিলে সবাই জানতো। যাত্রাবাড়ীতে গণসংযোগের দিন তারা বলছিলেন: শনির আখড়ায় সবাই কিন্তু রাগ করে আছে, সেইদিকে গেলেনই না। আশুলিয়াতে কয়েক ঘণ্টা মাত্র গণসংযোগ চলেছিল, তারা অভিযোগ করলেন মাত্র হাজার দশেক প্রচারপত্র সেখানে গিয়েছে। শনিবার শ্রমিকদের কাজের দিন, তারপরও কয়েকদিন গণসংযোগ করা হলে অনেক শ্রমিক ছুটি নিয়ে আসতেন, তাদের দৃঢ় বিশ্বাস। পরীক্ষা শেষ করে বাস ধরেছেন যে ছাত্ররা, তারাও বললেন, সুন্দরবন শুনেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে তারা। সময় দেয়া গেলে তাদের সংখ্যা অনেক বাড়তো। একই অভিযোগ কেরানীগঞ্জেও, কেন্দ্রীয় দুটো দল মাত্র একদিন গিয়েছে সেখানে। এর বাইরেও ঢাকার মত বিশাল শহরে এই কটা পোস্টারে হয় না, কোটি মানুষের রাজধানীতে অন্তত লাখ দশেকের প্রচারপত্রও দরকার ছিল। ধানমণ্ডি-মিরপুর-মোহাম্মদপুর-মুগদার সামান্য এলাকাতেই গিয়েছে গণসংযোগ। আর এর বাইরেও তো বিশাল শহরটা বাকি পড়ে থাকলো।

জাতীয় কমিটির একটা গাড়ি ঢাকা শহরে দুই দিন ছুটে বেড়িয়েছে বটে, কিন্তু তা যদি দুই সপ্তা ছুটতো! সবগুলো রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে যদি পাড়া-মহল্লা ধরে ধরে প্রচার চলতো!

এই সমাবেশের সবচে বড় আর্জন এই শিক্ষাই, মানুষ সুন্দরবনকে রক্ষা করতে মরিয়া। তাদের এই আবেগকে বাঁধতে হবে চেতনার একটা সুতো দিয়ে, মালা গাঁথতে হবে নতুন আকাঙ্ক্ষার।

খারাপ শাসনের এই্ একমাত্র নিদান। বদলে যাওয়া জনতাই শাসনে বদল ঘটাতে পারে। কেননা, তার আকাঙ্ক্ষার বদল ঘটলেই সে নতুনতর ব্যবস্থার উপযুক্তও হয়ে ওঠে। বদলে যাওয়া জনতাকে পাওয়া যেতে পারে কেবল জনতার নতুন নতুন অংশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে, জনগণের মাঝে নতুন আকাঙ্ক্ষার বীজ বপন করে। অর্থাৎ রাজনৈতিক কর্মীদেরো যোগ্যতার আর আকাঙ্ক্ষার বদল ঘটিয়ে।

যা কিছু মিললো, তাই সম্বল করে আমরা তাই আরও বড় মনোবল নিয়ে নামবো সুন্দরবনকে বাঁচাতে, দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরাশাসনের খপ্পর থেকে বাংলাদশকে রক্ষা করতে।

 

সূত্রঃ ফেসবুক পোস্ট