আহাদ আহমেদ।।

সম্পাদকীয়(বণিক বার্তা)

 

নিয়াটা ছিল শূন্যতায় ভরা/ ছিল সেটা জনতা আর ক্ষমতায় উপচে পড়া এক পিণ্ড/ ছিল ঋতুহীন লতাগুল্ম-বৃক্ষহীন, মনুষ্য-প্রাণহীন মৃত্যুর এক দলা/ যেন শক্ত কাদার এক এলোমেলো আঁকিবুঁকি/ সাগর, নদী, হ্রদ ছিল ঠায় দাঁড়ানো/ এবং কোনো কিছুই এসবের নিস্তব্ধ গভীরতায় দেয় না নাড়া— লর্ড  বায়রন, দ্য ডার্কনেস।

বায়রন এ কবিতা ১৮১৬ সালে লিখেছিলেন, যখন মাউন্ট তাম্বোরা থেকে অতিরিক্ত সালফার উদ্গীরণের ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা হ্রাস পেয়েছিল। এমনকি ইংল্যান্ডের গ্রীষ্মকালও অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল—Year without a Summer.

বৈজ্ঞানিক কুজ্ঝটিকা, জবরদস্তি ও প্রশাসনিক দাপট

দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দূষণ হলো বায়ুদূষণ। এর কারণ বোধহয় জীবনের জন্য শ্বাস নিতে যে বায়ু আমাদের প্রাণ বাঁচায়, সে বাতাসই হতে পারে প্রাণহারী। একজন মানুষ দিনে গড়ে ২২ হাজার বার শ্বাস নেয়, প্রায় ১৬ কেজি বাতাস। মানুষ ১৬ কেজি খাবার দিনে খায় না, এমনকি ১৬ কেজি পানিও না, যদি জীবনধারণের জন্য ১৬ কেজি খাবার কিনে খেতে হতো বা পানি, তাহলে এ প্রাণীটি অনেক আগেই দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু প্রকৃতি কি অপার মহিমায় দাম ছাড়াই জনপ্রতি ১৬ কেজি বাতাস দিয়ে যাচ্ছে তার বেঁচে থাকার জন্য। একজন মানুষ খাবার ছাড়া পাঁচ সপ্তাহ, পানি ছাড়া পাঁচদিন; কিন্তু বাতাস ছাড়া ৫ মিনিটের বেশি বাঁচতে পারে না। প্রকৃতির প্রতিশোধ বুঝতে যাদের অসুবিধা হচ্ছে, তাদের জন্য এই বায়ুদূষণ বোঝাই যথেষ্ট। এর পরও যদি কেউ না বোঝে, তবে সেটার সবটাই দ্রব্য ও বস্তুগুণ। রামপালের থার্মাল পাওয়ার প্লান্টের পক্ষের লোকদের ‘বৈজ্ঞানিক তথ্যের’ মধ্যে যত না বিজ্ঞান আছে, তার চেয়েও বেশি আছে বৈজ্ঞানিক কুজ্ঝটিকা, জবরদস্তি ও প্রশাসনিক দাপট। খোদ প্রধানমন্ত্রী দাভোস সম্মেলনেও ক্রিটিক্যাল-সুপার ক্রিটিক্যাল নিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।

কয়লাভিত্তিকউন্নত প্রযুক্তি (!!)

কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কনভেনশনাল পদ্ধতি ও আধুনিক পদ্ধতির মধ্যে কোনো ফারাক নেই। যেটাকে পুরনো পদ্ধতি বলা হচ্ছে, সেখানেও কয়লা পুড়িয়েই পানিকে বাষ্প করা হয় এবং এই বাষ্প দিয়ে টারবাইন সচল করা হয়, যেখানে কয়লার দাহ্য (Combustion) ক্ষমতার ৩২-৩৩ শতাংশ ব্যবহার করা যায়। আর যেটাকে আধুনিক ‘সুপার ক্রিটিক্যাল (SC)’  বা ‘আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল (USC)’ বলা হচ্ছে, সেটাও মূলত পানিকে বাষ্পে পরিণত করেই টারবাইন চালাতে হচ্ছে। পানি ভিন্ন তাপে ও চাপে তিনটি দশায় থাকে— কঠিন (বরফ), তরল (পানি) ও বায়বীয় (বাষ্পীয়)। পানির একটা ক্রিটিক্যাল টেম্পারেচার থাকে। অতি উচ্চচাপ ও তাপে পানিকে ক্রিটিক্যাল টেম্পারেচার অতিক্রম করলে পানি তার তরল ও বাষ্পীয় অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। এক্ষেত্রে যেটা হয়, এই ‘সুপার বা আলট্রা সুপার’ স্তরে পানির তরল ও বাষ্পীয় অবস্থার মধ্যে কোনো প্রভেদ থাকে না। কয়লার দাহ্যক্ষমতা দাঁড়ায় ৪৫ শতাংশ। কিন্তু এমন একটি রাসায়নিক অবস্থার জন্য বিশেষ মেকানো-কেমিক্যাল অ্যাটমোস্ফিয়ার তৈরি করতে হয়, যেটার খরচ অনেক বেশি। অল্প কয়লায় বেশি তাপের এই রাসায়নিক প্রক্রিয়া মানে বেশি খরচ। এ খরচের হিসাব আমলে নিলে কম্বাস্টনের শতকরা হারের বৃদ্ধি এক শুভঙ্করের ফাঁকি। এটি অনেকটা অতিরিক্ত সার, বিষ, পানি, নিড়ানি দিয়ে বেশি ফসল উৎপাদনের মতো। মূলত সুপার বা আলট্রা সুপার হলো গালভরা বুলি বা বিশেষণ, বিজ্ঞানে যার কোনো মূল্য নেই। এখানে হিসাব দিয়ে বলতে হবে ‘আধুনিক’ পদ্ধতিটি কত শতাংশ সক্ষমতা প্রদর্শন করে একই শক্তি ও খরচ ব্যবহার করে?

এটি অত্যন্ত জটিল রাসায়নিক পদ্ধতি, যেখানে প্লান্টভেদে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে বিভিন্ন গ্যাসের এমিশন ভিন্ন ভিন্ন হয়, যা নির্ভর করে প্লান্টের মেকানিক্যাল ডিজাইন, কয়লা দহন পদ্ধতি ও পরিচালন পদ্ধতির ওপর। কয়লা পোড়ালে যেসব গ্যাস উত্পন্ন হবে সেগুলো হলো— কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, সালফার ট্রাই-অক্সাইড, নাইট্রিক অক্সাইড। একটি সহজ রসায়ন হলো, কয়লা সে যে গ্রেডেরই হোক না কেন, তা পোড়ালে এ গ্যাসগুলো নির্গত হবেই। বৈজ্ঞানিক কুজ্ঝটিকা হলো, গ্যাস হবে কিন্তু সেটা ৯৮ শতাংশ রিকভারি হওয়া সম্ভব। হ্যাঁ সম্ভব। কিন্তু তার জন্য পয়সা গুনতে হবে। আরেকটা বড় ফাঁক থেকে যায়। এ ফাঁকটি হলো, ৯৮ শতাংশ রিকভারড অক্সাইডগুলো দিয়ে কী করা হবে?

একটি বেসিক প্রশ্ন যদি করা যায় যে, এসব ‘অত্যাধুনিক পরিবেশবান্ধব’ পদ্ধতিতে কয়লা পুড়িয়ে যে নাইট্রিক অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ট্রাই-অক্সাইড উৎপাদন হবে, যদি তর্কের খাতিরে ধরা হয় যে, ৯৮ শতাংশ এসব গ্যাস এক্সট্রাকশন করা হবে, তবে সেই গ্যাসগুলো অতি উচ্চচাপে কি তরল করা হবে নাকি পানিতে দ্রবীভূত করা হবে? এসব গ্যাসের মধ্যে কিছু অস্থায়ী গ্যাস আছে, যারা স্থায়ী যৌগে পরিণত হবেই। এটি রসায়নের সাধারণ নিয়ম। যেমন— সালফার ট্রাই-অক্সাইড, নাইট্রিক অক্সাইড ইত্যাদি। আর যদি পানিতে দ্রবীভূত করা হয়, তবে সেখান থেকে কার্বনিক অ্যাসিড, সালফিউরাস-সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রাস-নাইট্রিক অ্যাসিড উত্পন্ন হবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ইতিহাস এর প্লান্ট নির্গত পানির pH ৩-৪-এর মধ্যে থাকে অর্থাৎ অ্যাসিডিক নেচারের। এই নির্গত পানি ঠাণ্ডা না গরম, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের এসব বিজ্ঞানীর বর্তমান ও পূর্বপুরুষদের ক্ষমতা নেই এই প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানোর। কানাডা-মন্টানা সীমান্তের প্রায় ১০০ কিলোমিটার নদীর পানি এভাবে অ্যাসিডিক হওয়ার কারণে মাছ ও জলজ প্রাণী ধ্বংস হয়েছিল, ধ্বংস হয়েছিল গ্রিজলি ভালুকের প্রজাতি, ট্রট ফিশ ও অনেক প্রাণবৈচিত্র্য।

কয়লা রসায়নের ক্ষতির দিক

প্রথমেই একবার অক্সাইডগুলো, যেগুলো পলুট্যান্টস হিসেবে কাজ করে, তার দিকে একটু নজর দেয়া যাক। সালফার ডাই-অক্সাইড গ্যাস শ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে মিউকাস মেমব্রেনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় সালফার ডাই-অক্সাইড জারিত বা অক্সিডেশন হয়ে সালফার ট্রাই-অক্সাইডে পরিণত হয়। এ দুটি গ্যাসই পানির বাষ্পীয় বা তরল অবস্থার সংস্পর্শে এসে সালফিউরাস বা সালফিউরিক অ্যাসিডে পরিণত হয়, যার pH  ৩-৪-এর মধ্যে বিদ্যমান। সালফিউরাস বা সালফিউরিক অ্যাসিড পানিতে গিয়ে এর মধ্যে বসবাসকারী প্রাণের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তোলে। সালফার ট্রাই-অক্সাইড ডাই-অক্সাইডের তুলনায় একটি শক্তিশালী যন্ত্রণাদায়ক গ্যাস। এমনকি স্বল্পমাত্রার উপস্থিতিতেও এটি মারাত্মক ব্রঙ্কোস্পাজম বা শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করে।

কার্বন মনক্সাইডের এক শক্তিশালী আকর্ষণী ক্ষমতা থাকে রক্তের হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে এবং এটা কারবক্সিহিমোগ্লোবিন, COHb তৈরি  করে। শরীরের কোষকলায় হিমোগ্লোবিনের অক্সিজেন বহনের ক্ষমতা হ্রাস পায়। অক্সিজেনের তুলনায় কার্বন মনক্সাইডের প্রায় ২০০ গুণ হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সক্ষমতা থাকে। যে কারণে স্বল্পমাত্রার কার্বন মনক্সাইডও সহজেই কারবক্সিহিমোগ্লোবিন, COHb তৈরি করে ফেলে। কার্বন মনক্সাইড সহজেই মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আঘাত করে। হার্ট অ্যাটাক ও উচ্চ মৃত্যুহারের জন্য দায়ী এই কার্বন মনক্সাইড। নাইট্রোজেনের সাতটি অক্সাইডের মধ্যে দুটি তীব্রমাত্রার ক্ষতিকর। ১৫ পিপিএম নাইট্রিক অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড চোখ ও নাকের জন্য যন্ত্রণাদায়ক এবং এই মাত্রা ২৫ পিপিএম হলে পালমোনারি অস্বস্তি সৃষ্টি হয়।

ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কীভাবে বৃদ্ধি পায়

অনেকের ধারণা ফসিল ফুয়েলের অসম্পূর্ণ দহন ও অক্সিডেশনই কেবল কার্বন মনক্সাইড তৈরি করে, কথাটার মধ্যে অর্ধসত্য আছে। ‘কোল রিফিউজ’ বা কয়লার বর্জ্যের মধ্যেই বা তলানিতে কার্বন মনক্সাইডের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। সাধারণভাবে অর্ধবিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানের বুলি কপচানোদের কাছে কার্বনের এই মনক্সাইডের ওপর ক্ষোভটা একটু বেশি। কারণ এটি সরাসরি জীবন কেড়ে নেয়। আর কার্বনের অন্যান্য অক্সাইড যেমন— কার্বন ডাই-অক্সাইড এ কাজটা করে ধীরে; বায়ুমণ্ডলে জমা হয়ে এর ‘কম্বল’ বা আস্তরণটাকে ভারী করে বৃদ্ধি করে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা।

রসায়নবিজ্ঞানে মারকভনিকভ রুলস বলে একটা সূত্র আছে। এর মূল কথা হলো— তেলে মাথায় তেল দেয়া ‘The H-rich get H-richer’। এগুলো সবই প্রাকৃতিক নিয়ম। তেলে মাথায় তেল দিয়ে পরিবেশ যে সমূহ ক্ষতির শিকার হবে, রামপালকেন্দ্রিক সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জীবন ও জীবিকা, জল, জমি-ভূমি  জলাশয় যে বিনাশের মুখে পতিত হবে— সেটা পরিমাপ করা নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি— এনটিপিসির ‘পজিটিভ’ বিজ্ঞান ও বিজ্ঞাপন দ্বারা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এনটিপিসি ভারতীয় কোম্পানি হিসেবে বাংলাদেশে সরকারি শক্তির ওপর ভর করে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে। কিন্তু ভারত ক্রমেই এ কয়লা ব্যবহারে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যাচ্ছে তার নিজ দেশে। চীনে ১০০ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা হচ্ছে। আমাদের দেশের অর্ধশিক্ষিত বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা পরিবেশচিন্তায় এখনো ইউরোপের তুলনায় ৫০ বছর পিছিয়ে আছেন, কিন্তু ইউরোপ ভ্রমণে ১০০ বছর এগিয়ে। এরা নাইট্রিক অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, আলট্রা ক্রিটিক্যাল, আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল ইত্যাদি শব্দ নিয়ে গালভরা অনেক কথাই বলেন, তা যত না বস্তুগত, তার চেয়ে বেশি বায়বীয়।

কয়লায় যদি দূষণ না-ই হবে, তবে এনটিপিসি কলকাতায় রাজভবনের পাশে তা পোড়ায় না কেন? দুনিয়াতে মাংস খাওয়ার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। কারণ এটি সিদ্ধ করতে বেশি শক্তির দরকার, মানে বেশি তাপ। আর আমাদের কোম্পানির পণ্ডিতরা দু-একটি ফ্ল্যাট, বাড়ি, বাসা, বিদেশ ভ্রমণের লোভে পড়ে ক্ষতি করছেন দেশের। আরো নতুন নতুন ধারণা সামনে আসছে, যেসব দেশে বড় আকারের বাণিজ্যিক গো-খামার আছে, সেখানে গো-খামারে গরুর জাবরকাটা, ঢেঁকুর ও ‘বায়ু নির্গমন’ থেকে যে মিথেন গ্যাস সৃষ্টি হয়, সেটিও বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। ইংরেজিতে Scammer বলে একটি শব্দ আছে, যার অর্থ ‘দুষ্ট লোকটি’— জনগণকে ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে কেউ একজন যখন প্রতারণা করে তেমন। বাংলাদেশে এ দুষ্ট লোকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যারা তাদের তাত্ক্ষণিক লাভালাভের জন্য যে কাউকেই বন্ধক রাখতে পারে।

আমরা শুধু যদি ভারতের তথ্য-উপাত্তকেই ধরি, তবে ২০০১-০২ থেকে ২০০৯-১০— এই নয় বছরে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে CO2, SO2, NO নির্গতের মাত্রা ভয়ঙ্কর। উৎপাদন পদ্ধতি যা-ই হোক না কেন, আধুনিকীকরণ ঘটুক না কেন, সেটি শুধু যন্ত্রপাতির খরচ বাড়াবে কিন্তু দূষণ কমাতে পারবে না; দূষণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু এ দূষণ হজম করাতে হবে প্রকৃতিতেই, তা সে ভূগর্ভস্থ পানিতে হোক, মুক্ত জলাধারে হোক বা সুউচ্চ চিমনি দিয়ে বায়ুমণ্ডলেই হোক। আমরা ওপেন চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি, এসব পথ ছাড়া অন্য কোনো উপায় যদি রামপালওয়ালারা দেখাতে পারেন, আমরাও এর পক্ষাবলম্বন করব।

ক্রিটিক্যাল, সুপার ক্রিটিক্যাল বা আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল— যে পদ্ধতির কথা ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির’ বিজ্ঞানী-প্রকৌশলীরা উল্লেখ করুক না কেন, এটি অনেকটা প্রেসারকুকারে মাংস সিদ্ধ করার মতো, যেখানে পুরনো পদ্ধতির খোলা হাঁড়িতে রান্নার সঙ্গে এর তফাত হলো— এটি ‘ক্লোজডভেসেল হাইপ্রেসার কুকিং’। এতে সময় কম লাগে বটে, তবে ‘অতিরিক্ত’ চাপ-তাপ প্রয়োজন এবং এতে ‘অতিরিক্ত’ বাষ্পের উদ্গীরণও ঘটে।

এনটিপিসি, ভারত কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তার নিজ দেশে পরিবেশবিদদের সমালোচনার মুখে বন্ধ করে দিচ্ছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সেই তারাই বাংলাদেশের সুন্দরবনঘেঁষে তৈরি করছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভারতেই তলিয়ে যেতে পারে ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার; লাক্ষা দ্বীপ, উর্বর সমতল ভূমি, নিম্ন জলাভূমি হাওয়া হয়ে যেতে পারে। এর ফলে ভারতের ৫০ মিলিয়ন আর বাংলাদেশের ৭৫ মিলিয়ন মানুষকে উদ্বাস্তু হতে হবে। উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে আবাদযোগ্য জমি মরুকরণের শিকার হবে। আর মাত্র ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে ভারতের ২৪ শতাংশ আবাদি জমি সংখ্যায় পরিণত হবে। ফলে ভারতে ২৫ শতাংশ খাদ্য সরবরাহ কমে আসবে, শিকার হবে খাদ্য ঘাটতির। এই পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্ট ও গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে সার্কের আরেক দেশ পাকিস্তানে প্রতি বছর এক লাখ একর জমি লবণাক্ততার কারণে পতিত হচ্ছে। যে চীনে সারা দুনিয়ার ২০ শতাংশ মানুষের বাস, সেখানে ৭ শতাংশ জমি এরই মধ্যে মরুকরণের শিকার, বার্ষিক ক্ষতির হিসাবে যা ৬৫ বিলিয়ন ডলার।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে ১৩ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবন বিরান হবে— এটা নিশ্চিত। ভাড়াটেরা যা-ই বলুক। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ছাই, অ্যাসিডিক পানি, গরম পানি, ভারী ধাতু উজান-ভাটির ১০০ কিলোমিটার পানিপ্রবাহে বিষ ছড়াবে। প্রাণ-জীববৈচিত্র্য, জীবনযাত্রা ধ্বংস করে দেবে। সুন্দরবন আর ফিরে আসবে না। সেই ক্ষতি পোষানোর কিছু নেই। প্রথমে আমরা একটা নেড়ে বন পাব, শেষে লবণাক্ত পতিত প্রাণহীন প্রান্তর। আর দাভোসে প্রধানমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, যদি তার শাসনামলে বনের পরিমাণ ৭ থেকে বেড়ে ১৭ শতাংশ হয়ে থাকে, এমনকি তার লক্ষ্যমাত্রা যদি ২৫ শতাংশ হয়, তবে তিনি এই হেরিটেজ ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংসের উদ্যোগ কেন নেবেন! কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৪ না ১৭ কিলোমিটার দূরত্ব, সেটা বড় প্রশ্ন নয়; প্রশ্নটি হলো বায়ুপ্রবাহ ভূগর্ভস্থ বা সারফেস ওয়াটারের ওপর কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, এখানে কোনো দপ্তরের কোনো আইন চলে না। অতিঘনত্বের এ দেশে এই ক্ষতির পরিমাপ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

তথ্যসূত্র: কয়লার কার্বন মনক্সাইড উত্স— Environmental Engineering, Howard S Peavy, Rowe and Geoge Tchobanglous, পৃষ্ঠা ৪৪৫

Air Pollution : Sources of Air Pollutions by MN Rao, HVN Rao, পৃষ্ঠা ১০

The Great Derangement by Amitabh Ghosh, পৃষ্ঠা ১৮৭

 

লেখক: রসায়নবিদ, প্রাবন্ধিক, সাবেক ছাত্রনেতা

 

সূত্রঃবণিক বার্তা(http://bonikbarta.com/news/2017-01-22/103782/)